নিজের ব্যবসা শুরু করতে চান, কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজি নেই? তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করেছে ‘উদ্যোগ’ (UDYOG) কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় যোগ্য তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসার প্রয়োজন ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, এ কর্মসূচির আওতায় সহায়ক জামানত ছাড়াও ঋণ দেওয়া যেতে পারে। তবে সর্বোচ্চ সীমার অর্থ সবার জন্য নিশ্চিত নয়। আবেদনকারীর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, অর্থের প্রকৃত চাহিদা, যোগ্যতা এবং ব্যাংকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
প্রথম আলো ও চ্যানেল২৪-এর প্রতিবেদনে এ কর্মসূচির আওতায় তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ এবং দেশজুড়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। নিচে তরুণ উদ্যোক্তা ঋণের যোগ্যতা, টাকার পরিমাণ, আবেদন ফরম সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদন করার নিয়ম বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
এক নজরে তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ ২০২৬
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| কর্মসূচির নাম | উদ্যোগ (UDYOG) |
| পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান | বাংলাদেশ ব্যাংক |
| কর্মসূচির উদ্দেশ্য | তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, ব্যবসায় অর্থায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি |
| মোট তহবিল | ৫০০ কোটি টাকা |
| সর্বোচ্চ সমন্বিত অর্থায়ন | ২০ লাখ টাকা |
| সর্বোচ্চ ব্যাংকঋণ | ১০ লাখ টাকা |
| সর্বোচ্চ অনুদান | ১০ লাখ টাকা |
| ঋণ ও অনুদানের অনুপাত | ৫০:৫০ |
| আবেদনকারীর সর্বোচ্চ বয়স | আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে ২৮ বছর |
| আবেদন করার স্থান | সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখা |
| আবেদন ফরম | বাংলাদেশ ব্যাংক, এসএমই পোর্টাল বা ব্যাংকের শাখা থেকে |
| সহায়ক জামানত | নীতিমালা অনুযায়ী জামানত ছাড়াও ঋণ দেওয়া যেতে পারে |
| অফিসিয়াল ওয়েবসাইট | https://www.bb.org.bd |
বিশেষভাবে মনে রাখুন: ১০ লাখ টাকা ঋণ এবং ১০ লাখ টাকা অনুদান—দুটিই সর্বোচ্চ সীমা। আবেদন করলেই পুরো ২০ লাখ টাকা পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যাংকের মূল্যায়ন ও অনুমোদনের ভিত্তিতে অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ১০ লাখ টাকা ঋণ কীভাবে দেওয়া হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিতে ব্যবসার জন্য ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে সমন্বিত অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত উদ্যোক্তা ব্যবসার প্রয়োজন অনুসারে ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অনুদান পেতে পারেন।
ঋণ ও অনুদানের হিসাব
| ব্যবসার জন্য অনুমোদিত মোট অর্থায়ন | ব্যাংকঋণ | অনুদান |
|---|---|---|
| ৪ লাখ টাকা | ২ লাখ টাকা | ২ লাখ টাকা |
| ৮ লাখ টাকা | ৪ লাখ টাকা | ৪ লাখ টাকা |
| ১২ লাখ টাকা | ৬ লাখ টাকা | ৬ লাখ টাকা |
| ১৬ লাখ টাকা | ৮ লাখ টাকা | ৮ লাখ টাকা |
| ২০ লাখ টাকা | ১০ লাখ টাকা | ১০ লাখ টাকা |
উপরের হিসাবটি ৫০:৫০ অনুপাতের ভিত্তিতে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রকৃত অর্থায়ন নির্ভর করবে অনুমোদিত ব্যবসায়িক ব্যয়, আবেদনকারীর প্রয়োজন এবং ব্যাংকের চূড়ান্ত মূল্যায়নের ওপর।
১০ লাখ টাকা কি পুরোপুরি অনুদান?
না। কর্মসূচির সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থায়নের কাঠামোতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, ঋণের অংশটি পরিশোধ করতে হবে। অনুদানের ক্ষেত্রেও কর্মসূচির শর্ত মানতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অথবা অনুদানের অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করলে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ ঋণে রূপান্তরিত হতে পারে। তাই অনুদান পেলেও অর্থ ব্যবহারের নিয়ম ও ঋণ পরিশোধের শর্ত গুরুত্বের সঙ্গে মানতে হবে।
তরুণ উদ্যোক্তা ঋণের সুদের হার কত?
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে এই কর্মসূচির আওতায় ব্যাংকঋণের সুদের হার ৪ থেকে ৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রযোজ্য সুদ বা মুনাফার হার, পরিশোধের সময়সীমা এবং অন্যান্য আর্থিক শর্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও প্রযোজ্য নীতিমালার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে।
আবেদন করার আগে ব্যাংক থেকে জেনে নিন:
- ঋণের ওপর প্রযোজ্য সুদের হার কত।
- কত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
- কিস্তি পরিশোধের সময়সূচি কী।
- অনুদানের শর্ত ও অর্থ ব্যবহারের নিয়ম কী।
- পোস্ট-ডেটেড চেকসহ কোন কোন দলিল দিতে হবে।
কারা তরুণ উদ্যোক্তা ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনকারীকে নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হবে।
১. বয়সসীমা
আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। আবেদন করার আগে বয়সের শর্তটি অবশ্যই যাচাই করুন।
২. সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে
আবেদনকারীকে যে উপজেলার কর্মসূচির আওতায় আবেদন করবেন, সেই উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। এ শর্তের প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কমিশনার বা কাউন্সিলরের দেওয়া নাগরিক সনদ অথবা প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে।
৩. ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে
আবেদনকারীর নিজস্ব ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা ব্যবসার ধারণা থাকতে হবে। নতুন ব্যবসা শুরু করতে চাইলে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে।
পরিকল্পনায় ব্যবসার ধরন, প্রয়োজনীয় পুঁজি, সম্ভাব্য ব্যয়, বাজারের চাহিদা এবং আয়ের সম্ভাবনা তুলে ধরা ভালো।
৪. আগে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক ঋণ নেওয়া যাবে না
নীতিমালা অনুযায়ী, আগে ব্যবসা পরিচালনার জন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে থাকলে আবেদনকারী এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবেন না।
৫. ঋণখেলাপি হওয়া যাবে না
কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি ব্যক্তি এ কর্মসূচির জন্য যোগ্য নন। ব্যাংকের CIB যাচাইয়ে ঋণখেলাপি প্রমাণিত হলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
৬. সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হওয়া যাবে না
সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা এ কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
৭. নিজস্ব ও বৈধ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকতে হবে
অন্যের ব্যবসায়িক ধারণা নিজের নামে ব্যবহার করা বা আবেদনে অসত্য তথ্য দেওয়া যাবে না। অসত্য তথ্য বা অন্যের ধারণা নিজের নামে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
কোন কোন ব্যবসার জন্য ঋণ পাওয়া যেতে পারে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুসারে বৈধ ব্যবসা বা উদ্যোগ এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হতে পারে। পুরোনো ব্যবসার পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়িক ধারণাকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
| ব্যবসার খাত | সম্ভাব্য উদ্যোগের উদাহরণ |
|---|---|
| কৃষি | সবজি চাষ, কৃষিপণ্য উৎপাদন ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ |
| খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ | খাদ্য উৎপাদন, প্যাকেজিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ |
| হস্তশিল্প | হস্তনির্মিত পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয় |
| মৎস্য | মাছ চাষ ও মৎস্যভিত্তিক ব্যবসা |
| পশুপালন | গবাদিপশু ও পোলট্রি খামার |
| পর্যটন | পর্যটনসেবা ও স্থানীয় পর্যটনভিত্তিক উদ্যোগ |
| সেবা খাত | বিভিন্ন বৈধ সেবামূলক ব্যবসা |
| হালকা প্রকৌশল | যন্ত্রাংশ তৈরি ও মেরামতসেবা |
| নবায়নযোগ্য জ্বালানি | সৌরবিদ্যুৎ ও সংশ্লিষ্ট সেবা |
| প্রযুক্তি | প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ |
| অন্যান্য বৈধ উদ্যোগ | আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাময় বৈধ ব্যবসা |
এ তালিকা উদাহরণমাত্র। আবেদন করার আগে নিজের ব্যবসার ধরন কর্মসূচির নীতিমালার আওতায় পড়ে কি না, তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা থেকে নিশ্চিত করুন।
তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ১০ লাখ টাকা ঋণ ফরম কোথায় পাবেন?
অনেকেই অনলাইনে “তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ১০ লাখ টাকা ঋণ ফরম” লিখে খোঁজ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, এ কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত আবেদন ফরম ব্যবহার করতে হবে।
আবেদন ফরম সংগ্রহের উপায়:
১. বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন: https://www.bb.org.bd
২. ওয়েবসাইটের এসএমই-সংক্রান্ত বিভাগ বা এসএমই পোর্টালে কর্মসূচির আবেদন ফরম খুঁজুন।
৩. অংশগ্রহণকারী তফসিলি ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও ফরম পাওয়া যেতে পারে।
৪. অনলাইনে ফরম না পেলে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় গিয়ে আবেদন ফরম সংগ্রহ করুন।
গুরুত্বপূর্ণ: এটি শুধু অনলাইন ফরম পূরণের কর্মসূচি নয়। নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত ফরমে আবেদন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখায় জমা দিতে হবে। ফরম ডাউনলোড করা গেলেও আবেদন জমা দেওয়ার জন্য ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদন করার সময় সাধারণত নিচের নথিগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে। ব্যাংক প্রয়োজন অনুসারে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইতে পারে।
| ক্রম | প্রয়োজনীয় কাগজপত্র | উদ্দেশ্য |
|---|---|---|
| ১ | জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) কপি | পরিচয় যাচাই |
| ২ | নাগরিক সনদ বা প্রত্যয়নপত্র | সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা প্রমাণ |
| ৩ | সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, যদি থাকে | শিক্ষাগত তথ্য যাচাই |
| ৪ | পাসপোর্ট সাইজের ছবি | আবেদনকারীর পরিচিতি |
| ৫ | পূরণ করা নির্ধারিত আবেদন ফরম | আনুষ্ঠানিক আবেদন |
| ৬ | ব্যবসায়িক পরিকল্পনা | উদ্যোগের ধরন, ব্যয় ও সম্ভাব্য আয় তুলে ধরা |
| ৭ | প্রয়োজনীয় অর্থায়নের হিসাব | ব্যবসার জন্য কত টাকা দরকার তা ব্যাখ্যা করা |
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় NID, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (যদি থাকে), পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং পূরণ করা আবেদন ফরমের কথা উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণও দিতে হবে।
ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও আর্থিক হিসাব প্রস্তুত রাখুন। এগুলো আবেদনকারীর উদ্যোগের বাস্তবতা এবং অর্থায়নের প্রয়োজন মূল্যায়নে সহায়ক হবে।
তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ আবেদন করার নিয়ম: ধাপে ধাপে
এই কর্মসূচিতে আবেদন করার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।
ধাপ ১: নিজের যোগ্যতা যাচাই করুন
প্রথমে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে ২৮ বছর বা তার কম, আপনি সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা এবং আপনার ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা রয়েছে।
আগে ব্যবসায়িক ঋণ নেওয়া, ঋণখেলাপি হওয়া বা সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার মতো অযোগ্যতার বিষয়গুলোও যাচাই করুন।
ধাপ ২: ব্যবসার পরিকল্পনা তৈরি করুন
আপনি কী ব্যবসা করতে চান, কোথায় করবেন, কী কী সরঞ্জাম বা উপকরণ লাগবে এবং কত টাকা প্রয়োজন—এসব লিখে একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন।
পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন:
- ব্যবসার নাম ও ধরন।
- ব্যবসার অবস্থান।
- পণ্য বা সেবার বিবরণ।
- প্রাথমিক বিনিয়োগের হিসাব।
- মাসিক পরিচালন ব্যয়।
- সম্ভাব্য বিক্রয় ও আয়।
- সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সংখ্যা।
ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করুন
NID, নাগরিক সনদ বা প্রত্যয়নপত্র, শিক্ষাগত সনদ (যদি থাকে), ছবি এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখুন। মূল কাগজপত্রের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ফটোকপি সঙ্গে নিন।
ধাপ ৪: আবেদন ফরম সংগ্রহ করুন
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, এসএমই পোর্টাল বা তফসিলি ব্যাংকের ওয়েবসাইটে নির্ধারিত আবেদন ফরম খুঁজুন। প্রয়োজনে ব্যাংকের শাখা থেকে ফরম সংগ্রহ করুন।
ধাপ ৫: ফরম সঠিকভাবে পূরণ করুন
আবেদন ফরমে নিজের পরিচয়, ঠিকানা, ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের তথ্য নির্ভুলভাবে লিখুন। ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সঙ্গে অর্থের হিসাব যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
ধাপ ৬: সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখায় আবেদন জমা দিন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন জমা দেওয়া যায়। যে ব্যাংকে আবেদন করবেন, সেখানে আগে থেকেই হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয় বলে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে আবেদন জমা দেওয়ার আগে শাখাটিতে কর্মসূচির আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করুন।
ধাপ ৭: জমা দেওয়ার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন
আবেদন জমা দেওয়ার পর ব্যাংক থেকে প্রাপ্তি স্বীকার, ট্র্যাকিং নম্বর বা অন্য কোনো রেফারেন্স দেওয়া হলে সেটি সংরক্ষণ করুন। পরবর্তীতে আবেদনের অবস্থা জানতে এটি কাজে লাগতে পারে।
ধাপ ৮: ব্যাংকের যাচাই ও মূল্যায়নের জন্য প্রস্তুত থাকুন
আবেদন জমা দিলেই ঋণ অনুমোদিত হয় না। ব্যবসায়িক ধারণার যৌক্তিকতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা, বাজারের সম্ভাবনা, আর্থিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনা করে আবেদন মূল্যায়ন করা হবে।
ব্যাংক অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাইলে তা সরবরাহ করুন।
ধাপ ৯: অনুমোদিত অর্থায়নের শর্ত বুঝে নিন
আবেদন অনুমোদিত হলে ঋণের পরিমাণ, সুদের হার, কিস্তি, পরিশোধের সময়সীমা, অনুদানের শর্ত এবং অন্যান্য দলিল সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন। সব শর্ত বুঝে তারপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করুন।
তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ আবেদন: চেকলিস্ট
আবেদন জমা দেওয়ার আগে নিচের তালিকা মিলিয়ে নিন।
- আবেদনকারীর বয়স ২৮ বছরের মধ্যে।
- সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণ রয়েছে।
- বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক ধারণা বা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
- আগে ব্যবসায়িক ঋণ নেওয়ার বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে।
- ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি নন।
- সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নন।
- জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি প্রস্তুত।
- নাগরিক সনদ বা প্রত্যয়নপত্র প্রস্তুত।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, যদি থাকে, প্রস্তুত।
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি প্রস্তুত।
- নির্ধারিত আবেদন ফরম পূরণ করা হয়েছে।
- ব্যবসার ব্যয় ও প্রয়োজনীয় অর্থের হিসাব তৈরি করা হয়েছে।
- সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখায় আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
- আবেদন জমার প্রমাণ বা রেফারেন্স সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
৫০০ কোটি টাকার তহবিল ও অর্থায়ন কীভাবে পরিচালিত হবে?
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অংশ ২৫০ কোটি টাকা এবং সহযোগী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অংশ ২৫০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় ৫০৩টি উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করা, যোগ্য উদ্যোগ নির্বাচন করা এবং ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়নের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা আবেদন গ্রহণ ও যাচাইয়ে ভূমিকা পালন করবে।
আবেদনকারীদের ব্যবসায়িক প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় বাজারের সম্ভাবনা, আর্থিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে।
আবেদন শুরুর তারিখ ও শেষ সময়
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে আটটি জেলায় ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে আবেদন নেওয়া হয়েছিল। জেলাগুলো হলো নেত্রকোনা, রংপুর, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, হবিগঞ্জ, ভোলা, মানিকগঞ্জ ও ফেনী।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, এই আট জেলার বাইরে অন্যান্য জেলার তরুণেরা ১ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন।
| আবেদন পর্যায় | তারিখ |
|---|---|
| আট জেলায় পরীক্ষামূলক আবেদন | ১৬ সেপ্টেম্বর–১৫ অক্টোবর |
| অন্যান্য জেলার জন্য প্রতিবেদনে উল্লেখিত সময় | ১ নভেম্বর–৩০ নভেম্বর |
আবেদন করার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছ থেকে আপনার জেলার জন্য আবেদন গ্রহণের সময়সূচি নিশ্চিত করুন। কোনো সময়সূচি পরিবর্তিত হলে সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
১. ১০ লাখ টাকা নিশ্চিত নয়: এটি ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সীমা। অনুমোদিত অর্থের পরিমাণ কম হতে পারে।
২. অনুদানও শর্তসাপেক্ষ: অনুদানের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করতে হবে। নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করলে অনুদানের অর্থ ঋণে রূপান্তরিত হতে পারে।
৩. অনলাইনে আবেদন করলেই হবে না: নীতিমালায় নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখায় আবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৪. দালাল এড়িয়ে চলুন: আবেদন বা ঋণ অনুমোদনের নিশ্চয়তা দেওয়ার নামে কাউকে টাকা দেবেন না। ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
৫. সরকারি তথ্য যাচাই করুন: আবেদন ফরম, সময়সীমা, সুদের হার ও অন্যান্য শর্তের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকের তথ্যকে অগ্রাধিকার দিন।
সার্কুলারের PDF Offical
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ ২০২৬-এর আওতায় সর্বোচ্চ কত টাকা পাওয়া যাবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত উদ্যোক্তার জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা সমন্বিত অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান হতে পারে।
২. বিনা জামানতে ১০ লাখ টাকা ঋণ কি পাওয়া যাবে?
নীতিমালায় বলা হয়েছে, এ কর্মসূচির আওতায় সহায়ক জামানত ছাড়াও ঋণ দেওয়া যেতে পারে। তবে ঋণ অনুমোদন নির্ভর করবে আবেদনকারীর যোগ্যতা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং ব্যাংকের মূল্যায়নের ওপর।
৩. তরুণ উদ্যোক্তা ঋণের জন্য সর্বোচ্চ বয়স কত?
আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে।
৪. তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ আবেদন ফরম কোথায় পাওয়া যাবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট https://www.bb.org.bd, এসএমই পোর্টাল, তফসিলি ব্যাংকের ওয়েবসাইট অথবা ব্যাংকের শাখা থেকে নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ করা যেতে পারে।
৫. অনলাইনে কি আবেদন করা যাবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাই শুধু অনলাইন ফরম পূরণ করলেই আবেদন সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
৬. আগে ব্যাংকঋণ নেওয়া থাকলে কি আবেদন করা যাবে?
নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া থাকলে আবেদনকারী এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবেন না।
৭. ঋণের সুদের হার কত?
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ৪–৭ শতাংশ সুদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে প্রযোজ্য সুদের হার ও পরিশোধের শর্ত নিশ্চিত করুন।
৮. কোন কোন ব্যবসার জন্য আবেদন করা যাবে?
কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপসহ আইনসম্মত ব্যবসায়িক উদ্যোগ বিবেচিত হতে পারে।
৯. ঋণ পেতে কি আগে থেকেই ব্যাংক হিসাব থাকতে হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, যে ব্যাংকে আবেদন করবেন, সেখানে আগে থেকে হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে অর্থ বিতরণ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার জন্য ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
১০. আবেদন করলেই কি ২০ লাখ টাকা পাওয়া যাবে?
না। অর্থায়নের পরিমাণ নির্ভর করবে ব্যবসার প্রকৃত চাহিদা, প্রস্তাবিত ব্যয়, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং চূড়ান্ত মূল্যায়নের ওপর।
অফিসিয়াল লিংক ও তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ ব্যাংক: https://www.bb.org.bd
- প্রথম আলো: উদ্যোক্তা হতে ঋণ চান ৮ জেলার সাড়ে ১৮ হাজার তরুণ
- চ্যানেল২৪: তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে ‘উদ্যোগ’ প্রকল্প
- বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা (PDF): উদ্যোগ কর্মসূচির নীতিমালা
- ইত্তেফাক: ব্যবসা করতে পাবেন ২০ লাখ টাক
তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন সুযোগ। যোগ্য আবেদনকারীরা ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অনুদানসহ সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা সমন্বিত অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হতে পারেন।
আপনি যদি তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ আবেদন করতে চান, তাহলে প্রথমে নিজের যোগ্যতা যাচাই করুন, বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করুন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করুন। আবেদন ফরম, সময়সীমা, সুদের হার ও অন্যান্য শর্তের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
📢 আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন!
আমাদের নতুন পোস্ট ও আপডেট পেতে ফেসবুক পেজে লাইক ও ফলো দিয়ে পাশে থাকুন। আপনার সাপোর্ট আমাদের অনুপ্রেরণা ❤️
👍 Like Our Facebook Page