ঈদুল আযহা ইসলামের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিনগুলোর একটি। এই দিনটি শুধু আনন্দ-উৎসবের নয়, বরং এটি ইবাদত, ত্যাগ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অসাধারণ সুযোগ। হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অতুলনীয় ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে এই দিনটি প্রতি বছর আমাদের কাছে ফিরে আসে। ঈদুল আযহা দিনের আমল ও ঈদুল আযহার দিনের দোয়া সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখলে এই মহান দিনটিকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
ঈদুল আযহার দিনটি কেন এত বিশেষ?
আল্লাহ তায়ালা গোটা বছরের মধ্যে কিছু দিনকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ — অর্থাৎ ঈদুল আযহার দিন — সেই বিশেষ দিনগুলোর অন্যতম। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় দিনগুলোর মধ্যে ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন অন্যতম। এই দিনে আমল করা, দোয়া করা এবং আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
ঈদুল আযহা দিনের আমল — সকাল থেকে রাত পর্যন্ত
১. ফজরের আগে ঘুম থেকে ওঠা ও পবিত্রতা অর্জন
ঈদের দিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মিসওয়াক করা এবং সুন্দরভাবে ওজু করা সুন্নত। এরপর ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করুন। এই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, তাই ফজরের পর থেকেই ইবাদতে মনোযোগী হওয়া উচিত।
২. গোসল করা
ঈদের নামাজের আগে গোসল করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে, সাহাবায়ে কেরামও ঈদের দিন গোসল করাকে গুরুত্ব দিতেন।
৩. উত্তম পোশাক পরিধান করা
ঈদের দিন সবচেয়ে সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাক পরা সুন্নত। নতুন পোশাক না থাকলেও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরুন। পুরুষদের জন্য আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করাও সুন্নত।
৪. তাকবিরে তাশরিক পড়তে থাকা
ঈদুল আযহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো তাকবিরে তাশরিক পড়া। ৯ জিলহজ ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজ আসরের নামাজ পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর একবার তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব। এছাড়া পথে-ঘাটে, বাজারে, ঈদগাহে যাওয়ার সময় সর্বদা তাকবির পড়তে থাকুন।
اَللَّهُ أَكْبَرُ اَللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اَللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
৫. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া
রাসূলুল্লাহ (সা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং ভিন্ন রাস্তায় ফিরে আসতেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। ঈদগাহে যাওয়ার পথে উচ্চস্বরে তাকবির পড়তে পড়তে যান, তাহলে আশপাশের মানুষও উৎসাহিত হবেন।
৬. ঈদের নামাজ আদায় করা
ঈদুল আযহার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো ঈদের নামাজ আদায় করা। এটি ওয়াজিব। জামাতের সাথে ঈদের নামাজ পড়ুন এবং নামাজের পর ইমামের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। খুতবা শোনা সুন্নত।
৭. কোরবানি করা
ঈদের নামাজের পরেই কোরবানি দেওয়া শুরু করা উচিত। যার উপর কোরবানি ওয়াজিব, তার উচিত নিজ হাতে কোরবানি দেওয়া অথবা সামনে থেকে দেখা। কোরবানির আগে “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলে জবাই করতে হবে।
৮. কোরবানির গোশত তিন ভাগ করা
কোরবানির গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা মুস্তাহাব:
- এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য
- এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের জন্য
- এক ভাগ গরীব, মিসকিন ও অসহায় মানুষদের জন্য
৯. আত্মীয়-পরিজনের সাথে দেখা করা ও মোবারকবাদ জানানো
ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সাথে দেখা করুন। পরস্পর “ঈদ মোবারক” বা “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” বলে শুভেচ্ছা জানান। এই দোয়াটির অর্থ হলো: “আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের আমল কবুল করুন।”
১০. বেশি বেশি দোয়া ও জিকির করা
ঈদুল আযহার দিন অত্যন্ত বরকতময়। এই দিনে বেশি বেশি ইস্তিগফার, দরুদ শরিফ এবং দোয়া পড়ুন। এই দিনের দোয়া আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে কবুল হয়।
ঈদুল আযহার দিনের দোয়া — আরবি, উচ্চারণ ও অর্থসহ
দোয়া ১: ঈদের মোবারকবাদের দোয়া
সাহাবায়ে কেরাম একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতেন এই দোয়ায়:
تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ
উচ্চারণ: তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।
অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (সকলের) আমল কবুল করুন।
দোয়া ২: কোরবানির পশু জবাই করার দোয়া
بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُ أَكْبَرُ، اَللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাক।
অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ সর্বমহান। হে আল্লাহ! এটি তোমার পক্ষ থেকে এবং তোমারই জন্য।
দোয়া ৩: নিজের পক্ষে কোরবানি দেওয়ার সময়
اَللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنِّي كَمَا تَقَبَّلْتَ مِنْ خَلِيلِكَ إِبْرَاهِيمَ وَحَبِيبِكَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন খালিলিকা ইব্রাহিমা ওয়া হাবিবিকা মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমার এই কোরবানি কবুল করো, যেভাবে তুমি তোমার বন্ধু ইব্রাহিম ও তোমার প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ (সা.)-এর কোরবানি কবুল করেছিলে।
দোয়া ৪: পরিবারের পক্ষে কোরবানি দেওয়ার সময়
اَللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ آلِ (নিজের নাম)
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন আলি (নিজের নাম)।
অর্থ: হে আল্লাহ! (নিজের নাম)-এর পরিবারের পক্ষ থেকে এই কোরবানি কবুল করো।
দোয়া ৫: বেশি বেশি পড়ার জন্য তাসবিহ
ঈদের দিন নিচের তাসবিহগুলো বেশি বেশি পড়ুন:
সুবহানাল্লাহ:
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র ও সকল প্রশংসা তাঁর জন্য, মহান আল্লাহ পবিত্র।
দোয়া ৬: ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া (ইস্তিগফার)
ঈদুল আযহার দিন বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ুন:
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিমাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহ।
অর্থ: আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও সর্বসত্তার ধারক, এবং আমি তাঁর কাছে তওবা করছি।
দোয়া ৭: দরুদ শরিফ
ঈদের দিন বেশি বেশি দরুদ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ:
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।
দোয়া ৮: সার্বিক কল্যাণের দোয়া
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দাও, আখিরাতেও কল্যাণ দাও এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করো।
ঈদুল আযহার দিনে যেসব কাজ থেকে বিরত থাকবেন
এই পবিত্র দিনে কিছু বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত:
- অনর্থক সময় নষ্ট করা, মোবাইলে অতিরিক্ত সময় দেওয়া বা বিনোদনে মগ্ন থাকা।
- গরীব ও অসহায়দের থেকে কোরবানির গোশত আটকে রাখা।
- অহংকার ও বড়াই করা — ঈদের দিনটি বিনয় ও কৃতজ্ঞতার দিন।
- পশু কোরবানিতে অবহেলা করা বা কষ্ট দেওয়া।
- ঈদের নামাজ ছেড়ে দেওয়া বা অলসতা করা।
ঈদুল আযহার দিনের বিশেষ ফজিলত
ইসলামি পণ্ডিতরা বলেন, ঈদুল আযহার দিনে আল্লাহর ইবাদত এবং দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়। এই দিনে:
- সকাল থেকে তাকবির পড়া হয়, যা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণার প্রতীক।
- কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পায়।
- গরীব-মিসকিনদের মধ্যে গোশত বিতরণে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
- পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বন্ধন মজবুত হয়।
হাদিসে এসেছে, কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে তা কবুল হয়ে যায়। তাই কোরবানি শুধু পশু জবাই নয়, এটি আল্লাহর কাছে হৃদয়ের সমর্পণ।
সংক্ষিপ্ত আমলের তালিকা — এক নজরে
| সময় | আমল |
|---|---|
| ভোরবেলা | ঘুম থেকে উঠা, মিসওয়াক, গোসল |
| ফজরের পর | তাকবিরে তাশরিক, জিকির |
| ঈদগাহে যাওয়ার আগে | সুন্দর পোশাক, আতর, তাকবির পড়তে পড়তে যাওয়া |
| ঈদগাহে | নামাজ আদায়, খুতবা শ্রবণ |
| নামাজের পর | কোরবানি, গোশত বণ্টন |
| সারাদিন | আত্মীয় দেখা, দোয়া, জিকির, ইস্তিগফার |
ঈদুল আযহা দিনের আমল ও ঈদুল আযহার দিনের দোয়া সঠিকভাবে পালন করলে এই দিনটি কেবল উৎসবের দিন না হয়ে প্রকৃত অর্থেই ইবাদতের দিনে পরিণত হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এই মোবারক দিনের পূর্ণ ফায়দা হাসিল করার তওফিক দান করুন। আমাদের নামাজ, কোরবানি, দোয়া ও সকল আমল কবুল করুন। আমিন।
ঈদ মোবারক — تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ
